ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬

যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়ছে, মরিয়া ট্রাম্প এখন ইরানে হামলা চালালে ঘটতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাষ্যকার টাকার কার্লসন বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন 'কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে' বলে তার কাছে তথ্য রয়েছে।


চলতি সপ্তাহের শুরুতে তিনি বলেন, হামলার লক্ষ্য হতে পারে মধ্য ইরানের পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দাবি, ইরান সরকার সেখানে আবারও পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি শুরু করেছে।


তবে কার্লসনের যেকোনো বক্তব্য সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।ডানপন্থী এই ভাষ্যকার চলতি বছর বেশ কয়েকটি ইস্যুতে ট্রাম্পের সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন। তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব রয়েছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুর দিকের নানা তথ্য ফাঁস করে লেখা 'ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি'- বইয়ের লেখক মাইকেল উলফ অতীতে কার্লসনকে তার 'প্রধান গোপন তথ্যসূত্র' বলে উল্লেখ করেছেন।


তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও কার্লসনের দাবির পক্ষে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'আর এক বা দুটি স্থাপনা বাকি আছে, যেগুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনও রয়েছে। আমরা ১০ মিনিটের মধ্যে এটি করতে পারি। এ জন্য আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে এবং খুব দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে পারি।'


ইরানে এরপর কী ঘটবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। গত সপ্তাহে ডানপন্থী মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউজম্যাক্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্লসনের বক্তব্যের আগেই ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র বা কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে নাকচ করেছিলেন।


তবে ট্রাম্পের আচরণ অনেক সময় অনুমান করা কঠিন। এ সপ্তাহে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছেন তিনি। ফলে যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ শেষ করার জন্য দেশের ভেতর থেকে তার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হতে পারে। কিন্তু পারমাণবিক বোমা তৈরি ঠেকাতে নিজেই পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করার মধ্যে যে পরিহাস ও নির্বুদ্ধিতা রয়েছে, তা কারও নজর এড়ানোর কথা নয়।

তবে যুক্তরাষ্ট্র কেন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা বিবেচনা করবে, তা একেবারেই স্পষ্ট নয়।


পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের গভীরে সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্র রয়েছে। এসব অস্ত্র দিয়ে পাহাড়ের ভেতরের সুড়ঙ্গগুলো ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব। এতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি ছাড়াই স্থাপনাটি অকার্যকর করে দেওয়া যাবে।


পারমাণবিক অস্ত্র অন্য যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে আলাদা। কারণ, এর বিস্ফোরণ ও তাপের প্রভাব অন্য যেকোনো ধরনের বিস্ফোরক অস্ত্রের তুলনায় বহুগুণ বেশি। এ ছাড়া এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ ও অমানবিক।


এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হলে আশপাশের এলাকার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে বাষ্পীভূত হয়ে মারা যাবেন। বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক প্রভাবের বাইরে থাকা মানুষও প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ও পরবর্তী অগ্নিকাণ্ডের শিকার হবেন। একই সঙ্গে তাদের শরীরে উচ্চমাত্রার বিকিরণ ছড়িয়ে পড়বে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দুটি পারমাণবিক বোমা হামলার পর যেমন ঘটেছিল, তেমনি বিকিরণজনিত অসুস্থতায় পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে অনেক মানুষের মৃত্যু হতে পারে। ওই দুই হামলায় কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।


পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্ফোরণে তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়, যাকে বলা হয় 'ফলআউট'। অস্ত্রটি কী পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়েছে, কোথায় বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং আবহাওয়া কেমন—এসবের ওপর নির্ভর করে এই তেজস্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডলে পৌঁছে মাশরুমের মতো মেঘ তৈরি করে। বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে থাকা আবহাওয়াব্যবস্থা এই মেঘকে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে দেয়।


আবহাওয়া ও সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এটি কত দূর পর্যন্ত ছড়াবে। পরে বৃষ্টির সঙ্গে এসব তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিচে ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে। এমনকি এটি এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।


যুক্তরাষ্ট্র ইরানে পারমাণবিক হামলা চালালে তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে এবং আবহাওয়ার প্রভাবে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে। এতে মানুষের জীবন ব্যাপক ঝুঁকির মুখে পড়বে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ইরাকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


এ ধরনের হামলায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ এর বাইরেও গুরুতর অস্থিতিশীলতা দেখা দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক নিন্দা জানানো হবে। তবে অন্তত শুরুতে এটি স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার কল্পিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করবে না। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিপুলসংখ্যক পারমাণবিক বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময়ের পরিকল্পনা ছিল। এতে ইউরোপ, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের শহর ধ্বংস হয়ে যেত এবং লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারাত।


তবে মনে রাখা জরুরি, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু থেকেই বিশ্বযুদ্ধ ছিল না। শুরুতে এগুলো ছিল বিভিন্ন অঞ্চলের ছোট পরিসরের যুদ্ধ। পরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, এতে একই পক্ষগুলোর হয়ে অনেক দেশ জড়িয়ে যায় এবং আরও দেশ অংশ নেয়।


এ ধরনের ভয়াবহ ও অপ্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ফলে ধীরে ধীরে সংঘাত আরও বাড়তে পারে। এর জেরে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা অন্য অঞ্চলগুলোকেও প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে আরও বেশি দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের উদ্যোগে সমর্থন না দিয়ে নিজেরাই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কথা ভাবতে পারে।


এ ছাড়া এর অনিবার্য পরিণতি হবে আরও বেশি সন্ত্রাসবাদ। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং দেশটির মিত্ররাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন এমন ঝুঁকি নিতে চাইবেন, তা বোঝা কঠিন।


মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ঐতিহাসিক পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে, মার্কিনিরা যুদ্ধের বিরোধী।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, 'বিবেকের তাড়নায় হোক কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে—মার্কিনিরা যুদ্ধকে না বলেছেন। আমরাও এই বার্তাকে সমর্থন করি।'


তিনি আরও লেখেন, "যুক্তরাষ্ট্র সরকার যদি আন্তর্জাতিক প্রভু ও ব্ল্যাকমেইলারদের স্বার্থ রক্ষায় জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে, তাহলে তারা বুঝতে পারবে, আমাদের 'না' বলার পরিণতি দুঃস্বপ্নের মতো হবে।"


গত বছরের জুনে ইরানে হামলা চালালে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান ঘটবে এবং ক্ষমতাসীন সরকারের পতন হবে—ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রথমে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এমন ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিই ঘটেনি। ট্রাম্প বিষয়টি জানেন এবং সম্ভবত তার মনে হয়েছে, ইসরায়েলিরা তাকে হতাশ করেছে। 


তবে তাকে কী পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং তিনি কোন পথে এগোতে পারেন, তা বলা কঠিন।


যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা বাধা ছাড়াই কেবল একজন ব্যক্তি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে পারেন। আর সেই ব্যক্তি হলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট।


পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি এসব অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোর সব প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দেয়। মানুষ যত বেশি বিশ্বাস করবে যে পারমাণবিক অস্ত্র যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব—যেমন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনকে এমন হুমকি দিয়েছিলেন—তত বেশি অন্য দেশগুলো ভাববে, 'আমাদেরও হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত।'


কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনো দেশের এমন নেতা ছাড়া, যিনি নিজের দেশ ছাড়া অন্য কারও স্বার্থের পরোয়া করেন না, এমনকি নিজের দেশের নাগরিকদের নিয়েও খুব একটা চিন্তিত নন, অন্য কারো পক্ষে এসব অস্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব নয়। কারণ, এর প্রভাব ওই দেশের ওপরও ভয়াবহভাবে পড়বে।


শুধু নিজেদের জনগণের পরোয়া করে না, এমন কোনো স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষেই পারমাণবিক যুদ্ধে জড়ানো সম্ভব।


উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, উত্তর কোরিয়ার সরকার যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে দেশটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। এতে অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হবে এবং এর ফলে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধেরও আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।


একসময় এমন একটি ধারণা ছিল যে, প্রতিটি দেশের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে বিশ্বে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে। কিন্তু মানুষ সব সময় যুক্তিবাদী ও শান্ত স্বভাবের হয় না। আর ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরাও সব সময় সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করেন না।


মনে হচ্ছে, বিশ্বনেতারা এসব অস্ত্র কতটা ভয়াবহ, তা ভুলে গেছেন। যুক্তরাজ্যের অনেক মানুষেরই চেরনোবিল বিপর্যয়ের কথা মনে থাকার কথা। ওই ঘটনায় গ্রাফাইটচালিত একটি পারমাণবিক চুল্লিতে আগুন ধরে গিয়েছিল। ইউরোপজুড়ে তেজস্ক্রিয় বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ার সময় মানুষকে ঘরের ভেতরে অপেক্ষা করতে হয়েছিল এবং টিনজাত খাবার ও গুঁড়া দুধের মতো সংরক্ষিত খাবারের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করতে হয়েছিল।


পারমাণবিক অস্ত্রের হামলায় এর চেয়েও অনেক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। পারমাণবিক অস্ত্রের তুলনায় চেরনোবিলের ঘটনা ছিল অনেক ছোট পরিসরের এবং অনেক কম ভয়াবহ।


অবশ্য এমনও হতে পারে যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পারমাণবিক হামলার ভয় দেখাতে এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে টাকার কার্লসনকে এসব তথ্য দিয়েছে। 


তবে এখন পর্যন্ত ইরানকে দেওয়া হুমকিগুলো খুব একটা কার্যকর হয়নি। ইউক্রেনকে একই ধরনের হুমকি দিয়ে রাশিয়াও সফল হয়নি।


তবে ইরান যদি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক হামলা বা অন্য যেকোনো ধরনের হামলার ঝুঁকি কমাতে চায়, তাহলে দেশটির পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ হতে পারে।


সম্প্রতি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সঙ্গে ইরানের আলোচনা হয়েছে। সেখানে সংস্থাটি কীভাবে বাস্তবিকভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে নতুন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।


ইরান চাইলে আইএইএকে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানাতে পারে। এতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা কমবে। তা না করলে ইরান কেন সংস্থাটিকে সেখানে যেতে দিচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তোলাও ন্যায্য।

ads
ads
ads

Our Facebook Page

↑